Showing posts with label রচনা. Show all posts
Showing posts with label রচনা. Show all posts

Jan 16, 2019

রচনা: ছাত্র সমাজ ও রাজনীতি


(সংকেত: ভূমিকা; বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির পটভূমি; ছাত্ররাজনীতির গুরুত্ব; ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা; স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্রদের ভূমিকা; ১৯৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসমাজ; ছাত্ররাজনীতির অতীত ও বর্তমান; বর্তমানে ছাত্ররাজনীতির যৌক্তিকইতা; বর্তমান প্রেক্ষাটপটে ছাত্রদের করনীয়; উপসংহার।)
ভূমিকা: বিদ্যা অর্জন করা ছাত্র জীবনের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব। পাশাপাশি ছাত্রদের আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়। আজকের ছাত্রই যেহেতু আগামী দিনের নেতা তাই ছাত্রজীবন নেতৃত্ব গঠনের মূখ্য সময়। এজন্য ছাত্রদের বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে হয়। বলিষ্ট নেতৃত্ব গঠনের জন্য ছাত্র রাজনীতির বিকল্প নেই। বাংলাদেশে রাজনীতিতে ছাত্র রাজনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন স্থান দখল করে আছে। ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৯০ এর স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে ছাত্ররাই ছিল সামনের সারিতে।
বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির পটভূমি:বাংলদেশের ছাত্র রাজনীতির গোড়াপত্তন হয় বৃটিশদের আগমনের প্রায় ১০০ বছর পরে। বৃটিশদের অত্যাচার অনাচার থেকে মুক্তির জন্য ছাত্ররা বিভিন্ন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। স্বদেশি আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলনেও ছাত্ররা জনমত গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৭- এর দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রলীগ নামক ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলেন। এর পর থেকেই ছাত্ররা সাংগঠনিকভাবে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা সাংগঠনিকভাবে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যূত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও বাঙালি জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছে এই ছাত্ররাই।
ছাত্র রাজনীতির গুরুত্ব: জনদাবী আদায়ে ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা অনস্বীর্কায। অন্য কোনো শ্রেণি বা পেশার মানুষ ততটা সংগঠিত হতে পারে না যতটা হতে পারে ছাত্ররা। তারুণ্য নির্ভর তেজোদীপ্ত সংগঠিত ছাত্রদের দৃঢ় আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খানের মতো স্বৈরশাসকেরও পতন হয়েছে, তেমনি পতন হয়েছে স্বৈরশাসক এরশাদেরও। ছাত্ররা সমাজের সবচেয়ে বড় সচেতন গোষ্ঠী। রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোনো অন্যায় করলে ছাত্ররাই প্রথমে ফুঁসে উঠে তার প্রতিবাদ জানায়। এজন্যই সুশৃংখলিত এবং সুসংগঠিত ছাত্র রাজনীতি যেকোনো দেশের সার্বিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা:১৯৪৮ সালে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন ঘোষণা দিলেন “উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা” তখনই ছাত্র জনতা এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ছাত্ররা ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তোলে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে ছাত্ররা সরকারের জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে। এতে পুলিশ ছাত্রদের উপর নির্বিচারে গুলি চালায় আর শহিদ হন সালাম, রফিক, শফিক, বরকত সহ আরও অনেকেই। আন্দোলন আরো বেগবান হলে পাকিস্তানের অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠী মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়। ছাত্রদের আন্দোলনের কারণেই আমরা পেয়েছি আমাদের মাতৃভাষা।
৬২ এর শিক্ষা আন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা: ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থবিরোধী শিক্ষানীতি প্রনয়ণ করেন। পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররা এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলেন।
৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদের ভূমিকা:১৯৬৬ সালের ৬ দফাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলনকে দমিয়ে রাখার জন্য পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী “আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা” নামক একটি মামলা দায়ের করে। এতে প্রধান আসামী করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তখন ছাত্ররা বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য আসামীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবীতে আন্দোলন গড়ে তোলে। এই আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই গণঅভ্যুত্থানের চাপে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান পদত্যাগ করে। বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে করা মামলাও প্রত্যহার করে।
স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্রদের ভূমিকা:বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্রদের ভূমিকা বিশ্বনন্দিত। বিশ্বের এমন কোনো দেশ নেই যে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে সে দেশের ছাত্র সংগঠন এতো সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। এজন্যই ১৯৭১ সালের ২৫ শে র্মাচের কাল রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের উপরই প্রথম আক্রমন চালিয়েছিল পাকিস্তান হানাদার বাহিনী। কিন্তু তাতে ছাত্ররা দমে যায়নি বরং গোরিলা যুদ্ধ, সম্মুখ যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পর্যুদস্তু করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে।
১৯৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রসমাজ: ১৯৮০ এর দশকে হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ অবৈধভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে আন্দোলন দানা বাধঁতে শুরু করে। দীর্ঘ ৯ বছরের মাথায় ছাত্রদের আন্দোলনের তীব্রতায় স্বৈরাচার এরশাদের পতন হয়।
ছাত্ররাজনীতির অতীত ও বর্তমান:ছাত্ররাজনীতির অতীত অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল হলেও বর্তমানে তা আর নেই। বরং বর্তমান ছাত্র সংগঠনগুলো দ্বন্দ্ব-কলহ-সংঘর্ষ,চাদাবাজি,খুন ইত্যাদি অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। এতে যেমন পড়াশুনার স্বাভাবিক পরিবেশে নষ্ঠ হচ্ছে তেমনি অভিভাবকদের উদ্বিগ্নতাও বেড়ে যাচ্ছে। ২০০২ সালের ১৬ জুন বুয়েটের শিক্ষার্থী সনি মারা যায় ছাত্র সংঘর্ষের ফলে। ২০১১ সালে রাজশাহীতে, ২০১২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হত্যার ঘটনা নিষ্ঠুর ছাত্র রাজনীতিরই ফল। অথচ অতীতের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা ছাত্র রাজনীতির অনেক গৌরবময় অর্জন দেখতে পাই।
বর্তমানে ছাত্ররাজনীতির যৌক্তিকতা:বর্তমান সময়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের অনৈতিক কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হয়ে দেশের জনগণের মধ্যে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি উঠেছে। ছাত্ররা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের ফলে কেবল তারাই ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাই নয় বরং জনগণও এর ক্ষতিকর প্রভাবের মুখে পড়ছে। নৈতিক আদর্শ এবং জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্য দৃঢ় থাকলে বর্তমান সময়েও ছাত্র রাজনীতির আবশ্যকতা রয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্রদের করণীয়:বর্তমান ছাত্ররাজনীতির প্রতি নেতিবাচক ধারণা দূর করার জন্য ছাত্রদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। এজন্য তাদেরকে দেশের জন্য কল্যাণকর হয় এমন বিষয়গুলো নিয়ে সোচ্চার থাকতে হবে। সন্ত্রাস, নিজেদের মধ্যে মারামারি,চাঁদাবাজি বন্ধ করে নিজেদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। রাজনীতিবিদরা যেন ছাত্রদেরকে হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ব্যবহার করতে না পারে সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।
উপসংহার: বাংলাদেশে কিছু ক্ষেত্রে ছাত্র সংগঠনগুলোই আইন শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণ এবং দেশের অস্থিরতার জন্য দায়ী। এজন্য বাস্তবতার নিরীখে ছাত্ররাজনীতির লাগাম টেনে ধরা দরকার। তবে বর্তমানে ছাত্র নেতাদের ঐকান্তিক চেষ্টায় ছাত্ররাজনীতির সেই পুরনো ঐতিহ্য ফিরে পেতে পারে। এজন্য ছাত্রদেরকে ব্যক্তিস্বার্থ পরিত্যাগ করে জনস্বার্থের কথা মাথায় রেখে রাজনীতি করা উচিত। হীন মানসিকতার রাজনীতিবিদের হাতের ক্রীড়ানক না হয়ে দেশপ্রেমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছাত্ররাজনীতি করতে হবে।

Jan 10, 2019

ইভটিজিং


(সংকেত: ভূমিকা; ইভিটিজিং কী; ইভটিজিং-এর ধরণ; ইভটিজিং কেন এবং কারা করে; নৈতিকতার অবক্ষয় ও ইভটিজিং; ইভটিজিং-এর প্রভাব; বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইভটিজিং; ভিন্ন আঙ্গিকে ইভটিজিং; ইভটিজিং প্রতিরোধে করণীয়; উপসংহার।)
ভূমিকা:
“জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য- লক্ষ্মী নারী
সুষমা- লক্ষ্মী নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারি।”
- কাজী নজরুল ইসলাম
মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে নারীর অবদান অনস্বীকার্য। নারী মাতৃরূপে মমতা দেয়, ভাগনী রূপে স্নেহ দেয়, আবার প্রেয়সী রূপে দেয় প্রেরণা। কিন্তু এই পুরুষশাসিত সমাজ যুগে যুগে নারীকে তাঁর অধিকার থেকে করেছে বঞ্চিত, নানা ভাবে করেছে শোষণ। একবিংশ শতাব্দীতে নারী তাঁর হাজার বছরের অবরুদ্ধ জীবনের গ্লানি থেকে মুক্তি পেয়েছে বটে কিন্তু এখনো পায়নি তাঁর পরিপূর্ণ সামাজিক মর্যাদা। নারী সত্তার অপমৃত্যু ঘটাতে নতুন করে যুক্ত হয়েছে এর আদিম কর্দয প্রয়াস, যার নাম ‘ইভটিজিং’। সমাজের প্রতিটি স্তরে এক ভয়াবহ সংক্রামক ব্যাধি রূপে ছড়িয়ে পড়েছে ইভটিজিং। পুরুষশাসিত এই সমাজ ইভটিজিং এর মাধ্যমে মেয়েদেরকে ঠেলে দিচ্ছে করুণ পরিণতির দিকে।
ইভটিজিং কী: ইভটিজিং একটি ইংরেজি শব্দ যার অর্থ নারীদের উত্যক্ত করা। ‘ইভ’ হলো ‘হাওয়া’- যে পৃথিবীর প্রথম নারী। সুতরাং ইভটিজিং নারীদেরকে উত্যক্ত করাকে নির্দেশ করে। নারীদেরকে বিভিন্ন ভাবে হয়রানি করাই ইভটিজিং। একজন নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন ধরণের মন্তব্য করা, তাকে হেয় করে অশালীন কথা বলা, মানুষের সামনে অপদস্থ করা ইভটিজিং-এর মধ্যে পড়ে।
ইভটিজিং এর প্রভাব: সমাজে ইভটিজিং এর ভয়াবহ প্রভাব প্রতিদিনের সংবাদপত্রগুলোই আমাদেরকে বলে দেয়। সমাজের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, এবং নিম্নবিত্ত সকল শ্রেণির মেয়েরাই ইভটিজিং এর শিকার হয়। শতশত মেয়েরা ইভটিজিং-এর শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এছাড়া ইভটিজিং এর কারণে অনেক নারী লেখাপড়া বন্ধ করে দিচ্ছে যেটি দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের জন্য বিরূপ প্রভাব বয়ে আনবে। এর ফলে সামাজিক স্থিতিশীলতাও নষ্ট হচ্ছে।
ইভটিজিং কেন হয় এবং কারা করে:সমাজে ছেলেদের উচ্ছৃঙ্খল মানসিকতার জন্য ইভটিজিং হয়ে থাকে। ইভটিজিং-এর মাধ্যমে মেয়েদের হয়রানি করে তারা এক ধরণের বিকৃত প্রশান্তি লাভ করে। নারীবাদী সংগঠন "women for women'' এবং "Steps toward Development"-এর যৌথ সমীক্ষায় ইভটিজিংকারীদের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে জানা যায়- উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান ১৫% উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ৬০% এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান ২৭% ইভটিজিং-এর সাথে জড়িত। আর এটা থেকে প্রমাণিত হয় যে ইভটিজিং-এ সাধারণত মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই বেশি জড়িত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইভটিজিং:বাংলাদেশে একটি উন্নয়নশীল দেশ। এখানে সবশ্রেণির মেয়েরাই ইভটিজিং-এর শিকার হয় আমাদের দেশে ১২-১৪ বছরের মেয়েরা ২৮.৩৩%। ১৪-১৬ বছরের মেয়েরা ৫৬.৬৭% এবং ১৬-১৮ বছরের মেয়েরা ১৫% ইভটিজিং-এর শিকার হয়। এছাড়া একক পরিবারের মেয়েরা ৮৮.৩৩% এবং যৌথ পরিবারের মেয়েরা ১১,৬৭% ইভটিজিং-এর শিকার হয়।
নৈতিকতার অবক্ষয় ও ইভটিজিং:ইভটিজিং ও নৈতিকতার অবক্ষয় একটি অন্যটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইভটিজিং এর প্রধান কারণ হচ্ছে নৈতিকতার অবক্ষয়। এখনকার সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয় চরম আকার ধারন করেছে। এই পরিস্থিতি যুব সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যার ফলে তারা আর্দশহীন হয়ে যাচ্ছে। আজকের যুবসমাজ শিক্ষার মূল চেতনাকে অনুধাবন করতে পারছে না ফলে তারা নিজেদেরকে সুপথে পরিচালিত করতে পারে না। নানা ধরণের প্রতিকূল অবস্থার কারণে যুব সমাজ বিপথগামী হচ্ছে। আর এভাবেই চুরি, ছিনতাই, ডাকাতির মতো ইভটিজিং একটি দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
ইভটিজিং-এর ধরণ: বিভিন্ন সময়ে ইভটিজিং বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে। ইভটিজিং কারীরা বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে ইভটিজিং করে থাকে। ২০০৯ সালে ১৪ মে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে ইভটিজিং দূর করার জন্য কিছু নির্দেশ দেওয়া হয়। যে ধরণের কাজগুলো ইভটিজিং বলে গণ্য হয় সেগুলো হলো-
  • যেকোনো ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য বা রসিকতা।
  • গায়ে হাত দেয়া বা দেওয়ার চেষ্টা করা।
  • ই-মেইল, এসএমএস, টেলিফোনে বিড়ম্বনা।
  • পর্নোগ্রাফি বা যেকোনো ধরণের চিত্র, অশ্লীল ছবি, দেয়াল লিখনের মাধ্যমে বিরক্ত করা।
  • অশালীন উক্তিসহ আপত্তিকর কোনো ধরণের কিছু করা, কাউকে ইঙ্গিতপূর্ণ ভাবে সুন্দরী বলা।
  • কোনো নারীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন বা কোনো চাপ প্রয়োগ করা।
  • মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে সর্ম্পক স্থাপন করা, যৌন সম্পর্ক স্থাপনের দাবি বা অনুরোধ করা প্রভৃতি।
    ভিন্ন আঙ্গিকে ইভটিজিং: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির ফলে ইভটিজিং-এ এসেছে নতুনত্ব। ফেসবুকের মাধ্যমে ইভটিজিংকারীরা অশালীন ছবি বা কথার্বাতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফেসবুক হ্যাকিং-এর মাধ্যমে একজনের আইডি নিয়ে সেটিতে বিভিন্ন প্রকার সম্মানহানিকর ছবি সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে। এছাড়া ইন্টারনেটের মাধ্যমে কল করে ইভটিজিং করা হচ্ছে। ইভটিজিংকারীরা ফোনকেও বেছে নিয়েছে ইভটিজিং-এর হাতিয়ার স্বরূপ।
    ইভটিজিং প্রতিরোধে করণীয়: নারীর প্রতি এই অমানবিক নির্যাতন দূর করার জন্য সকল স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। নাগরিক সচেতনতা এবং সম্মিলিত প্রতিবাদের সম্বনয়ে ইভটিজিং প্রতিরোধ সম্ভব। নিচের বিষয় গুলো ইভটিজিং প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে-
    সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি: সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি করতে হবে। তাতে ইভটিজিং প্রতিরোধ সম্ভব হবে।
    আইন প্রণয়ন: ইভটিজিংকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে এবং এর যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।
    সচেতনতা বৃদ্ধি: সকল শ্রেণি পেশার মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ইভটিজিং প্রতিরোধের অন্যতম উপায়।
    শিক্ষার বিকাশ: শিক্ষা মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশে সাহায্য করে। এই শিক্ষার আলো যদি যুবসমাজে ছড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে তারা ভালো-মন্দ পার্থক্য করতে পারবে এবং খারাপ পথ থেকে সরে আসবে।
    পারিবারিক মূল্যবোধ: বাবা-মায়ের উচিত তাদের শিশুর মনুষ্যত্ব যেন পরিপূর্ণ ভাবে বিকশিত হয় সেদিকে খেয়াল রাখা। ছেলেরা যেন বাজে কোনো কাজে জড়িয়ে না পড়ে সেদিকে সর্তক দৃষ্টি রাখা। তাহলে ইভটিজিং কমে আসবে।
    নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি: পুরুষ যখন নারীকে সম্মান করতে শিখবে কেবলমাত্র তখনই নারীদের প্রতি অশালীন আচরন করতে তাদের বিবেক বাধা দিবে। সুতরাং নারীর মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।
    কর্মসংস্থান বৃদ্ধি: সকল বেকার যুবকের জন্য কাজের ব্যবস্থা করলে তারা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে এবং ইভটিজিং থেকে দূরে অবস্থান করবে।
    পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা: যে সকল জায়গাগুলোতে সাধারণত ইভটিজিং হয়ে থাকে যেমনঃ স্কুল, কলেজ, শপিং সেন্টার, ব্যস্ততম মোড় ইত্যাদি স্থানে পুলিশের তৎপরতা বাড়াতে হবে।
    মাদক দ্রব্যের ব্যবহার হ্রাস: মাদকসক্ত হয়ে যুবসমাজ তাদের বিবেক হারিয়ে নারীকে ইভটিজিং করে যাচ্ছে। তাই ইভটিজিং রোধে মাদকদ্রব্যের নিয়ন্ত্রন করা প্রয়োজন।
    উপসংহার:
    “নারীর বিরহে নারীর মিলনে, নর পেল কবি-প্রাণ
    যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান
    নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুধা, সুধায় ক্ষুধায় মিলে
    জন্ম লভিছে মহামানবের মহাশিশু তিলে তিলে।”
    - কাজী নজরুল ইসলাম
    নারী-পুরুষ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, একে অপরের সহযোগী। নারীর প্রতি পুরুষের সহিংসতা সমাজকে ভালো কিছু দিতে পারে না। এর ফলে সমাজ শুধু পিছিয়েই পড়ে । নারীর প্রতি পুরুষের সম্মান ও মর্যাদা প্রদান বদলে দিতে পারে আমাদের সমাজজীবন, বন্ধ করতে পারে ইভটিজিং এর মতো ঘৃন্য অপরাধ।
  • Jan 9, 2019

    যৌতুক প্রথা

    যৌতুক

    (সংকেত: ভূমিকা; যৌতুকের সংজ্ঞা; যৌতুক প্রথার উৎপত্তি ও ইতিহাস; যৌতুক প্রথার কারণ; যৌতুকের বিরূপ প্রভাব; নারী নির্যাতনে যৌতুক প্রথা; সাম্প্রতিককালে যৌতুকের বলি ও নারী নির্যাতনের চিত্র/ঘটনা; যৌতুক প্রথা রোধে গৃহীত পদক্ষেপ; যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে আইন ও যথাযথ প্রয়োগ; উপসংহার।)
    ভূমিকা: যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি। এর বিষক্রিয়ায় আমাদের গোটা সমাজ আক্রান্ত। বর্তমানে যৌতুক প্রথার ভয়াবহতা বাড়লেও এর প্রচলন প্রাচীনকাল থেকেই। নারীজীবনে এ প্রথা অভিশাপস্বরূপ। প্রতিনিয়ত অসংখ্য নারী অত্যাচারিত ও নিপীড়িত হচ্ছে যৌতুকের কারণে। পুরুষ শাসিত সমাজে নারীর সুখের সংসার ভেঙে যাচ্ছে যৌতুকের অভিশাপে। যৌতুকের করাল গ্রাসে নারীর সামাজিক ও মানবিক মর্যাদা লাঞ্ছিত হচ্ছে। যৌতুক প্রথা কেবল নারীকে মর্যাদাহীনই করে না বরং গোটা নারী জাতির উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করে সমগ্র দেশের উন্নয়নের গতিকে মন্থর করেছে।
    যৌতুকের সংজ্ঞা: যৌতুকের ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে '''Dowry'''। বিয়ের সময়, আগে, পরে কন্যাপক্ষ বরপক্ষকে যে সকল অর্থ, সম্পদ, অলংকার, আসবাবপত্র, বিনোদনমূলক সামগ্রী দিয়ে থাকে তাকেই যৌতুক বলা হয়। বর্তমানে ধনী পরিবারগুলোতে বিয়ের উপটোকন হিসেবে বাড়ি-গাড়ি ও জায়গা জমিও আদান-প্রদান হয়ে থাকে।
    যৌতুক প্রথার উৎপত্তি ও ইতিহাস:যৌতুক প্রথার উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু জানা যায় না। তবে প্রাচীনকাল থেকেই সমাজে এ প্রথা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে বিস্তার লাভ করেছে। প্রাচীন যুগের রামায়ন ও মহাভারতের বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্রের বিয়েতে যৌতুক আদান-প্রদানের ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। রাজা বল্লাল সেনের সময় প্রচলিত কৌলীণ্য প্রথার ফলে কন্যার পিতাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দানের চুক্তিতে কন্যা অরক্ষণীয়া হওয়ার আগেই কুলীন পাত্রে পাত্রস্থ করতে হত। এছাড়া একটু নিচু বংশের মেয়েকে উঁচু বংশে বিয়ে দিতে হলে মেয়ের বাবাকে পাত্র পক্ষকে প্রচুর অর্থ সম্পদ দেয়াটা ছিল তখনকার দিনের নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। এছাড়াও মধ্যযুগে মঙ্গলকাব্যসহ অন্যান্য কাব্যে যৌতুক প্রথার ব্যাপক প্রচলন সম্পর্কে জানা যায়।
    যৌতুক প্রথার কারণ: যৌতুক প্রথার প্রধান কারণ হচ্ছে অর্থলোভ। অনেক সময় অর্থের লালসায় ছেলের পরিবার ছেলেকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে থাকে। এছাড়াও আমাদের দেশে দারিদ্র্য বা আর্থিক দূরবস্থাও যৌতুক প্রথা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। দরিদ্রতার চাপে বা অভাবে পরে অনেকে যৌতুক নিয়ে থাকে। পুরুষ শাসিত সমাজে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস নারীদের উপযুক্ত মর্যাদাদানে বাধা দেয় যা যৌতুক প্রথাকে উদ্বুদ্ধ করে। শিক্ষা-দীক্ষায় অনগ্রসর নারীকে সমাজ মূল্যহীন ভাবে আর এর ফলে সৃষ্ট নারীর অজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতা যৌতুক প্রথা সৃষ্টির অন্যতম কারণ। এছাড়া অধিকারহীনতা ও অশিক্ষা, সামাজিক প্রতিপত্তি ও প্রতিষ্ঠা লাভের মোহ, উচ্চবিলাসী জীবনযাপনের বাসনা ইত্যাদি যৌতুক প্রথার অন্যতম কারণ।
    যৌতুকের বিরূপ প্রভাব: যৌতুক প্রথা আমাদের সমাজ জীবনে ব্যাপক সমস্যার সৃষ্টি করেছে। যৌতুকের লোভে পছন্দ অনুযায়ী বিয়ে না হওয়ায় অনেক সময়ই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিলবন্ধন তৈরি হয় না। যৌতুকের অর্থের পরিমাণ সামান্য কম হলেই দরিদ্র পরিবারের মেয়ের উপর নানারকম অসহনীয় অত্যাচার ও নির্যাতন করে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা। প্রতিনিয়ত স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির আবদার মেটাতে গিয়ে অনেক দরিদ্র মেয়ের বাবাই নিঃস্ব ও অসহায় হয়েছে। যৌতুকের চাহিদা মেটাতে না পেরে অনেক নারীকেই স্বামীগৃহ ত্যাগ করে পিতৃগৃহে ফিরে আসতে হয়। কখনো কখনো তালাকও প্রদান করা হয়। এভাবে প্রতিনিয়ত অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেক নারীই আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এ প্রথা নারী পুরুষের ভেদাভেদ ঘটিয়েছে, নারীকে সামাজিকভাবে হেয় ও পণ্যে পরিণত করেছে। শুধুমাত্র নারী ও পুরুষের মধ্যে অসমতাই সৃষ্টি করে না বরং সামাজিক কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে। এটি অত্যন্ত জঘন্য ও আমানবিক সামাজিক রীতি ও প্রথা যা নারীর মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে। অনেক দরিদ্র পিতা-মাতাই যৌতুকের অভিশাপে কন্যা সন্তানকে সানন্দে গ্রহণ করে না। যৌতুকের বিরূপ প্রভাব নারী জীবনের জন্য অবমাননাকর ও আত্মমর্যাদাহানিকর।
    নারী নির্যাতনে যৌতুক প্রথা: বর্তমানে যৌতুক প্রথার ফলে নিষ্ঠুরতা, নৃশংসতা ও নারী নির্যাতন স্বাভাবিক ব্যাপার। জন অস্টিন যৌতুক প্রথার দ্বারা নারী নির্যাতন সম্পর্কে বলেছেন, ''Dowry system paves the way to women oppression'' যৌতুকের অর্থ না দিতে পারলে সদ্য বিবাহিত নারীকে পদে পদে হেয়, নিচু ও বিদ্রƒপ করা হয়। এছাড়া শারীরিকভাবে অমানবিক নির্যাতনের দ্বারা হত্যা করে আত্মহত্যা বলে দাবি করে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকেরা। এছাড়াও শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, এসিড দগ্ধ করা কখনো পুড়িয়ে বা বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা, শ্বাসরোধ করে বা গলায় দড়ি আটকিয়ে মেরে ফেলা প্রভৃতি নৃশংসতা হয়ে থাকে যৌতুকের কারণে।
    সম্প্রতি যৌতুকের বলি ও নারী নির্যাতনের চিত্র: আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের সাম্প্রতিক রিপোর্টে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০১৩) দেখা যায়, ২০১৩ সালে মোট ২৬৫ জন নারী যৌতুকের বলি হয়েছে। এর মধ্যে ১০৯ জন শারীরিক নির্যাতনের শিকার, ৩ জন এসিডদগ্ধ, ৪ জন স্বামীর গৃহ থেকে বিতাড়িত, ১২৮ জন হত্যার শিকার ও ২১ জন আত্মহত্যা করেছে। ২০১২ সালের একটি রিপোর্টে দেখা যায়, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে যথাক্রমে মোট ৩৭ জন ও ২৪ জন যৌতুকের শিকার। ২০১২ সালের অক্টোবরে ৩৭ জনের মধ্যে ১৮ জন নির্যাতনের শিকার, ১৮ জন হত্যার শিকার ও ১ জন আত্মহত্যা করেছে। এছাড়া BSHER-এর রিপোর্টে দেখা যায়, ২০০৯-১০ বছরে, যৌতুকের ফলে ৩৫৮ জন মৃত ও ১৬৯ জন নির্যাতিত হয়েছে। এছাড়া আরেকটি রিপোর্ট A wife's darkest hour : Dowry violence in bangladesh- এ বলা হয়, ২০০৮ সালে ১৮৬ জন এবং ২০০৭ সালে ১৭২ জন যৌতুকের শিকার হয়েছে। অপর একটি রিপোর্ট' 'Dowry'- A social evil'-এ বলা হয়েছে ২০০৪ সালে ৩৬৭ জন মহিলা যৌতুকের শিকার হয়েছে।
    যৌতুক প্রথারোধে গৃহীত পদক্ষেপ: সমাজ থেকে যৌতুক প্রথার মূল উৎপাটনের জন্য দলমত নির্বিশেষে সকল শ্রেণি, পেশা ও ধর্মের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। সকলের সুস্থ্য মানসিকতা, বলিষ্ঠ জীবনবোধ এবং সমাজকল্যাণমূলক, গঠনশীল দৃষ্টিভঙ্গিই পারে যৌতুক প্রথা নিমূল করতে। যৌতুক প্রথারোধে বর্তমান তরুণ সমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। তরুণরাই পারে স্বশিক্ষিত ও বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন হয়ে যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে। এছাড়া নারীসমাজের প্রতি পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অত্যাবশ্যক। নারীকে পণ্যদ্রব্য হিসেবে বিবেচনা না করে নিজেদের অর্ধাঙ্গী হিসেবে সঠিক মর্যাদা দিতে হবে সমাজের প্রত্যেক পুরুষকে। পুরুষদের অর্থলোভ ত্যাগ করে নারীর গুণ ও গৌরবের তাৎপর্য উপলব্ধি করে সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যৌতুক দেয়া ও নেয়াকে ঘৃণ্য অপরাধ হিসেবে সকলকে বিবেচনা করতে হবে।
    যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে আইন ও যথাযথ প্রয়োগ: বাংলাদেশে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার বিভিন্ন আইন পাশ করেছে। নারীদের উন্নয়নের জন্য সরকার নারী উন্নয়ন ম্যাগনাকার্টা নামে পরিচিত ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি’ ঘোষণা করেছে। নারী নির্যাতন বন্ধে বিভিন্ন আইন প্রণীত হয়েছে। যেমনঃ (১) যৌতুক বিরোধী আইন ১৯৮০, (২) নারী নির্যাতন প্রতিরোধ আইন ১৯৮৩ (৩) বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ১৯৮৪, (৪) মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১ [সংশোধিত ১৯৮৫] (৫) পারিবারিক আদালত আইন ১৯৮৫, (৬) সন্ত্রাস বিরোধী আইন ১৯৯২, (৭) নারী ও শিশু নির্যাতন আইন ২০০০। নারী নির্যাতন বিরোধী আইনে যৌতুকের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন আইন ২০০০-এ বলা হয়েছে যৌতুকের কারণে কোনো নারীর মৃত্যু হলে এর শাস্তি হবে মৃত্যুদন্ড। মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টা করা হলে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হবে। যৌতুকের কারণে আহত করা হলে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড দেয়া হবে। আহত করার চেষ্টা করা হলে অনধিক ১৪ বছরের এবং সর্বনিম্ন ৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ড প্রদান করা হবে এবং সকল ক্ষেত্রে আর্থিক দন্ডের বিধান করা হয়েছে।
    উপসংহার: নারী জাতির উন্নয়নের জন্য যৌতুক নামক বিষবৃক্ষের শিকড় নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াসে সমাজ থেকে উপড়ে ফেলতে হবে। সমাজের সকলকে উপলব্ধি করতে হবে নারীরা আমাদেরই মা, বোন ও সন্তান। তাহলেই সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রে নারীদের সঠিক মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সম্ভব।

    পারমাণবিক বোমা


  • (সংকেত: ভূমিকা; পারমাণবিক বোমা কী; পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের ইতিহাস; বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক বোমার ব্যবহার; পারমাণবিক বোমা ও বিশ্বশান্তির অবনতি; পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ; পারমাণবিক বোমার ব্যবহার প্রতিরোধ; উপসংহার।)
  • ভূমিকা: আধুনিক বিশ্বসভ্যতার যুগে যা কিছু অভিশাপ স্বরূপ আবির্ভূত হয়েছে তার মধ্যে পারমাণবিক বোমা অন্যতম। পারমাণবিক বোমা আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকেই এটি বিশ্ববাসীর কাছে নিকৃষ্টতম বর্বরতার হাতিয়ার নামে বিবেচিত হয়ে আসছে। এর ব্যবহারে গোটা মানবগোষ্ঠী দেখেছে সভ্যতার এক ভয়ানক ও বীভৎস রূপ। বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিকানা বিশ্বের বুকে শক্তিধরের পরিচয় বহন করে। এরূপ অস্ত্র ও বোমার উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে নিজেকে মহাশক্তিধর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অভিপ্রায় প্রকাশ করে সবাই। তবে সাম্প্রতিককালে বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক বোমা ও অস্ত্রের নিরস্ত্রীকরণের জোর প্রচেষ্টা চলছে। কেননা এর অপব্যবহার মানুষের জীবনকে দাঁড় করিয়েছে মারাত্মক হুমকির মুখে।
    পারমাণবিক বোমা কী: পারমাণবিক বোমা হচ্ছে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্র। পরমাণুর কেন্দ্র বিভাজিত হওয়ার সময় উদ্ভুত শক্তির সাহায্যে প্রবলভাবে বিস্ফোরিত বোমাকে পারমাণবিক বোমা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। একে নিউক্লিয়ার বোমাও বলা হয়ে থাকে।
    পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের ইতিহাস: নৃশংস বর্বরতার প্রতীক পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের রয়েছে একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস। এই ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে বেশ কিছু বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও গবেষকের নাম। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে পারমাণবিক বোমা আবিষ্কারের প্রচেষ্টা শুরু হয় ১৯১৯ সালে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী রাদারফোর্ডের হাত ধরে। পরবর্তীতে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপক এই প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করেন নিজ নিজ গবেষণা কর্মের মাধ্যমে। জর্জ বি. প্রোগ্রাম, কন্যান্ট, ব্রিগম, লরেন্স, মারফ্রি প্রমুখ বিজ্ঞানীরা এ কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যান। ১৯৪৩ সালে বিজ্ঞানী ওপেনহেইমার এই প্রচেষ্টাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যান। তার ধারাবাহিকতায় ১৯৪৫ সালের প্রথম দিকে প্রথম পারমাণবিক বোমা আবিষ্কৃত হয়। এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ওপেনহেইমারকে বলা হয় পারমাণবিক বোমার আবিষ্কারক। আবিষ্কারের কিছুদিন পরেই বিশ্ববাসী দেখতে পেয়েছে এ বোমার ভয়াবহ ও মর্মান্তিক ব্যবহার।
    বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক বোমার ব্যবহার: পারমাণবিক বোমার ব্যবহার কতটা নিষ্ঠুর ও ভয়ংকর হতে পারে তা প্রথম প্রমাণিত হয় ১৯৪৫ সালে ২য় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে। যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে এ বোমা ব্যবহারের পরিণতি ছিল খুবই ভয়াবহ ও হৃদয় বিদারক। ১৯৩৯ সালে শুরু হয়ে ২য় বিশ্বযুদ্ধের ব্যপ্তি ছিল ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। সেই যুদ্ধে জার্মান-জাপান-ইতালি ছিল ফ্যাসিবাদী অক্ষশক্তি। পারমাণবিক বোমার আবিষ্কারক ওপেন হেইমারের পরিকল্পনা ছিল তৎকালীন নাৎসি বাহিনীর প্রধান হিটলারের বর্বরতা ও অত্যাচার থেকে জার্মান তথা মানবজাতিকে মুক্ত করার জন্য ঐ বোমা ব্যবহার করা হবে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সে সময় জাপানকেই সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করেছিল। যার ফলে চূড়ান্ত আক্রমণের জন্য তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হেনরি ট্রূম্যান জাপানকেই চিহ্নিত করেন। অবশেষে ১৯৪৫ সালের ৬ আগষ্ট বোমারু বিমানের মাধ্যমে মার্কিন বাহিনী জাপানের হিরোশিমা শহরে একটি ২০,০০০ টন টি.এন.টি শক্তিসম্পন্ন পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এর ফলে শহরের বিশাল অঞ্চল সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়ে যায়। প্রায় পুরো শহরজুড়ে তৈরি হয় ধ্বংসের মহাস্তুপ। বোমার বিস্ফোরণে মারা যায় প্রায় ৬৬ হাজার মানুষ এবং আহত হয় আরো ৬৯ হাজার। অথচ ঐ শহরের অধিবাসী ছিল প্রায় ৩,৪৩,০০০ জন। হিরোশিমা ধ্বংসযজ্ঞের রেশ কাটতে না কাটতেই একই মাসের ৯ তারিখ আবারো পারমাণবিক বোমা বিক্ষেপ করা হয় জাপানের নাগাসাকি শহরে। এতে মারা যায় প্রায় ৩৯ হাজার লোক এবং আহত হয় আরো ২৫ হাজার। পারমাণবিক বোমার আঘাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় প্রায় ৬০ হাজার ঘর বাড়ি। ১৯৪৫ সালের পর বোমার ব্যবহার তেমন প্রসারিত না হলেও বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারমাণবিক বোমা ও অস্ত্র ব্যবহার করার প্রবণতা এখনো দেখা যায়।
    পারমাণবিক বোমা ও বিশ্বশান্তির অবনতি: বিশ্বশান্তির ধারায় প্রবলভাবে আঘাত করেছে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা। কিন্তু বিশ্ব নেতারা এই ভয়াবহ ধ্বংসলীলা ও চরম অমানবিক আচরণের পরিণাম থেকে তেমন কোনো শিক্ষাগ্রহণ করেছে বলে মনে হয় না। যার ফলে বিশ্বে নতুন করে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি বরং দেশে-দেশে অরাজকতা ও শত্রুতা বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে। যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন প্রভৃতি ক্ষমতাধর রাষ্ট্র পারমাণবিক বোমা তৈরি ও ব্যবহার করার এক নোংরা খেলায় মেতে উঠেছে। যার ফলস্বরূপ বিশ্বশান্তি প্রতিনিয়ত চরম অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।
    পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহ: বর্তমান বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর মধ্যে শক্তির একটি মাপকাঠি হিসাবে পারমাণবিক বোমা ও অস্ত্র থাকা -না থাকাকে ধরা হয়। এর ভিত্তি শীর্ষ পাঁচটি ক্ষমতাশালী দেশকে পারমাণবিক শক্তি সমৃদ্ধ দেশ বলা হয়ে থাকে। দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও চীন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এরা নিউক্লিয়ার ক্লাব নামে পরিচিত। এই পাঁচটি দেশের বাইরেও ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া ও ইসরাইলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে মনে করা হয়।
    পারমাণবিক বোমার ব্যবহার প্রতিরোধ: আধুনিক সভ্যতাকে পারমাণবিক বোমা ও অস্ত্রের বিষাক্ত প্রকোপ থেকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সর্বপ্রথম উদ্যোগ নেয় ১৯৬৮ সালে। ১৯৭০ সালে প্রথম একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রাথমিকভাবে সেই নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল মাত্র ৩টি দেশ। পরে ১৯৯৫ সালে ঐ সংখ্যা বেড়ে ১৭৩- এ দাঁড়ায়। বিশ্ববাসীর এ ব্যাপারে সচেতনতার সূত্র ধরে প্রতিষ্ঠা লাভ করে আন্তর্জাতিক ‘রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংস্থা (OPCW)। পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার কমানো এবং ক্রমান্বয়ে বন্ধ করার জন্য গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সিটিবিটি (CTBT)। যার পূর্ণনাম হচ্ছে 'Comprehensive Nuclear Test Ban Treaty'। এটির উদ্দেশ্য ছিল নতুন করে কেউ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি এবং ব্যবহার করতে চাইলে তাতে বাধা দেওয়া। এ কথা পরিষ্কার যে, পারমাণবিক বোমার ভয়াবহতা থেকে বিশ্ববাসীকে রেহাই দিতে হলে দরকার মূলত অস্ত্র সমৃদ্ধ দেশগুলোর আন্তর্জাতিক সদিচ্ছা। নিজ নিজ অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করতে হবে সবার আগে। অন্যথায় চুক্তিপত্রের কার্যকারিতা কখনো সফলতার মুখ দেখবে না।
    উপসংহার: পারমাণবিক শক্তির আবিষ্কার নিঃসন্দেহে মানব সভ্যতার অন্যতম একটি কৃতিত্ব। এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের কল্যাণ সাধন করা যায়। অথচ এটা ব্যবহৃত হচ্ছে মানবজাতিকে ধ্বংস করার কাজে। পারমাণবিক বোমা ও শক্তি নিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যুদ্ধ পুরোপুরি নিরসন না করে বিশ্বে শান্তি স্থাপন করা সম্ভব নয়। মানব সভ্যতার হুমকি এই পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করার মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ করতে বিশ্বনেতাদের পদক্ষেপ অপরিহার্য। এক্ষেত্রে সবার আগে পারমানবিক অস্ত্র-সমৃদ্ধ দেশগুলোর এগিয়ে আসা উচিৎ।